top of page

সতীর ৫১ পীঠের কথা

  • sayanbcreator
  • Feb 19, 2024
  • 4 min read

শক্তিপীঠ হল হিন্দুধর্মের পবিত্র তীর্থগুলির মধ্যে অন্যতম ৷ প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, শক্তিপীঠ গুলিতে দেবী দাক্ষায়ণী সতীর দেহের নানান অঙ্গ প্রস্তরীভূত অবস্থায় রক্ষিত রয়েছে । সাধারণত ৫১টি শক্তিপীঠের কথা বলা হয়ে থাকলেও, শাস্ত্রভেদে পীঠের সংখ্যা ও অবস্থান নিয়ে মতভেদ রয়েছে। সকল ভক্তবৃন্দের কাছেই এই শক্তিপীঠ দর্শন হলো মহা পুণ্যের কাজ ।

সতী ছিলেন প্রজাপতি দক্ষের কন্যা। বাবার ইচ্ছাকে অমান্য করে সতী ভগবান শিবের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সতী এবং ভগবান শিব কৈলাশে সুখে বসবাস করতেন। তবে দক্ষ হতাশ হয়ে শিবকে অসম্মান করার পরিকল্পনা করছিলেন। দক্ষ তাই উত্তরাখণ্ডের কানখলে যজ্ঞের পরিকল্পনা করেছিল। ভগবান শিব ব্যতীত প্রত্যেককে (অন্য সমস্ত দেবদেবী) আমন্ত্রিত হয়েছিলেন । সতী সেই যজ্ঞের কথা জানতে পারেন এবং সেখানে বেড়াতে যাওয়ার জন্য খুব আগ্রহী হন এবং শিবকে তাঁর সঙ্গে আসতে অনুরোধ করেছিলেন। অনেক অনুরোধের পরেও ভগবান শিব সেখানে যেতে সম্মত না হলে সতী একা তাঁর পিতার বাড়িতে চলে যান । সকলে সেখানে সতী র সম্মুখে ভগবান শিব কে নিয়ে অপমানজনক আলোচনা করতে শুরু করেন যা সতীর পক্ষে সহ্য করা খুব কঠিন ছিল। পিতার মুখে স্বামী মহাদেবের নিন্দা যখন সতী আর সহ্য করতে পারছিলেন না তখনই চরম মুহূর্তটি উপস্থিত হয়েছিল। যজ্ঞের আগুনে আত্মঘাতী হন সতী। । এই সংবাদ শুনে ভগবান শিব ক্রূদ্ধ হন এবং তাঁর ক্রোধে সমস্ত যজ্ঞ ধ্বংস হয়ে যায় ।

মহাদেব এই শোকটি সহ্য করতে পারছিলেন না , ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠেন মহাদেব। সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রলয় নৃত্য শুরু করেন। তখন অন্যান্য দেবতারা ওই প্রলয় নৃত্য থামাতে অনুরোধ করেন । কিন্তু সকলেই যখন প্রলয় নৃত্য থামাতে ব্যর্থ হয় তখন পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার ভয়ে ভগবান বিষ্ণু প্রলয় থামাতে, সুদর্শন চক্র পাঠিয়ে দেন। সুদর্শন চক্র দ্বারা দেবীর দেহ ৫১টি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় পড়ে। এই সব কটি জায়গাকে সতীপীঠ বলা হয়। সতীর ৫১ পীঠ হিন্দু ধর্মে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গাগুলি প্রত্যেক এর কাছে পরম পবিত্র জায়গা। সতীর দেহের কিছু অংশ এশিয়ান উপমহাদেশে এবং বেশিরভাগ ভারতের বিভিন্ন জায়গা জুড়ে রয়েছে । ভারতীয় উপমহাদেশের নানা স্থানে এই শক্তিপীঠগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কলকাতার কালীঘাট, বীরভূমের বক্রেশ্বর, নলহাটি; বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবানীপুর ইত্যাদি বাংলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিপীঠ।ভারতবর্ষ-সহ বাংলাদেশ,পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কায় তেওঁ এই ৫১টি পীঠ অবস্থিত। শিব পুরাণ, কালিকা পুরাণ এবং দেবী ভাগবতম অনুসারে ৪ টি আদি শক্তি পীঠ রয়েছে। বিমালা (পদা খন্ড ) (ওড়িশার পুরী জগন্নাথ মন্দিরের ভিতরে), তারা তারিনী (স্থানা খন্ড, পূর্নগিরি, স্তন) (বহরমপুরের নিকটবর্তী, ওড়িশা), কামাখ্য মন্দির (যোনি খন্ড) (গুয়াহাটির নিকটবর্তী, আসাম) এবং দক্ষিনা কালিকা (মুখ খন্ড) (কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ) সত্যযুগে মাতা সতীর দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। শক্তি পীঠে যেখানেই সতী র দেহের অঙ্গ রয়েছে সেখানে ভগবান শিব ভৈরব হিসাবে বাস করেন। অর্থাৎ সকল শক্তিপীঠ সমূহে শক্তি দেবী এবং ভৈরব এক সঙ্গে অবস্থান করেন । সেই ৫১ টি শক্তি পীঠে হলো :

১। হিঙ্গুলা(হিংলাজ)—সতীর ব্রহ্মরন্ধ্র, করাচি, পাকিস্তান। (শক্তি – কোট্টরী ,ভৈরব – ভীমলোচন )

২। করবীর/সর্করারে- দেবীর ত্রিনেত্র, করাচি, পাকিস্তান। (শক্তি –মহিষমর্দিনী ,ভৈরব – ক্রোধিশ)

৩। সুগন্ধা- দেবীর নাসিকা, বরিশাল,বাংলাদেশ। (শক্তি – সুগন্ধা ,ভৈরব – ত্রয়ম্বক )

৪। অমরনাথ- সতীর কন্ঠ, শ্রীনগর। (শক্তি –মহামায়া , ভৈরব – ত্রিসন্ধ্যেশ্বর )

৫। জ্বালামুখী- সতীর জিহ্বা, পাঠানকোট। (শক্তি –সিদ্ধিদা (অম্বিকা) ,ভৈরব – উন্মত্ত ভৈরব )

৬। জালন্ধর- সতীর বামস্তন, জালন্ধর, পঞ্জাব। (শক্তি –ত্রিপুরমালিনী ,ভৈরব – ভীষণ )

৭। বৈদ্যনাথ- সতীর হূদপিণ্ড, দেওঘর, ঝাড়খণ্ড। (শক্তি – জয়দুর্গা ,ভৈরব– বৈদ্যনাথ)

৮। মানস ,মানসরোবর হ্রদ- সতীর ডান হাত, মানস সরোবর। (শক্তি – দক্ষিয়ানী,ভৈরব – অমর )

৯। নেপাল- সতীর জানুদ্বয়, গুজ্যেশ্বরী মন্দির, নেপাল। (শক্তি –মহাশিরা ,ভৈরব – কাপালী )

১০। উৎকল বিরজাক্ষেত্র- সতীর নাভী, পুরীর মন্দির চত্বরে।(শক্তি -বিমলা ,ভৈরব - জগন্নাথ )

১১। গণ্ডকী- সতীর গণ্ডদেশ, মুক্তিনাথ মন্দির, নেপাল। (শক্তি – গন্ধকী চণ্ডী , ভৈরব – চক্রপাণি)

১২। বহুলা- সতীর বাম বাহু, কেতুগ্রাম, বর্ধমান। (শক্তি – বেহুলা দেবী ,ভৈরব – ভীরুক )

১৩। উজানী- দেবীর ডান কনুই, গুসকরা, বর্ধমান। ( শক্তি – মাতা সর্বমঙ্গলা দেবী , ভৈরব –ভগবান শিব/মহাদেব)

১৪। চট্রল/চট্রগ্রাম- সতীর ডান বাহু, চট্রগ্রাম, বাংলাদেশ। (শক্তি –ভবানী ,ভৈরব – চন্দ্রশেখর )

১৫। ত্রিপুরা- সতীর ডান পা, ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির, ত্রিপুরা। (শক্তি – ত্রিপুরা সুন্দরী , ভৈরব – ত্রিপুরেশ )

১৬। ত্রিস্রোতা- সতীর বাম পা, জলপাইগুড়ি। (শক্তি – ভ্রামরী ,ভৈরব – অম্বর)

১৭। কামরূপ কামাক্ষা- সতীর যোনি, গুয়াহাটি। (শক্তি – কামাক্ষ্যা ,ভৈরব – উমানন্দ )

১৮। যুগাদ্যা- সতীর ডান পাদাঙ্গুষ্ঠ, ক্ষীরগ্রাম, বর্ধমান। (শক্তি –যোগাধ্যা ,ভৈরব – ক্ষীর খন্ডক )

১৯। কালিঘাট- সতীর ডান পাদাঙ্গুলি, কালিঘাট, কলকাতা। (শক্তি – কালিকা ,ভৈরব –নকুলেশ্বর )

২০। প্রয়াগ- দেবীর হাতের আঙুল, এলাহাবাদ। (শক্তি – ললিতা/মাধবেশ্বরী , ভৈরব – ভব)

২১। জয়ন্তী/জয়ন্তাতে- সতীর বাঁ জঙ্ঘা, শ্রীহট্র, বাংলাদেশ। (শক্তি – জয়ন্তী , ভৈরব –ক্রমাদিশ্বর )

২২। কিরীট/কিরীটকোণা- সতীর কিরীট অঙ্গ, মুর্শিদাবাদ।(শক্তি – বিমলা,ভৈরব – সাংবর্ত)

২৩। বারাণসী- দেবীর কর্ণ, বারাণসী। (শক্তি –বিশালাক্ষী ও মনিকর্ণী ,ভৈরব – কালভৈরব)

২৪। কন্যাশ্রম- দেবীর পৃষ্ঠদেশ, তামিলনাডু।(শক্তি – সর্বাণী, ভৈরব – নিমিষ)

২৫। কুরুক্ষেত্র- দেবীর গুল্ফ, হরিয়ানা।(শক্তি – সাবিত্রী ,ভৈরব – স্থনু )

২৬। মনিবেদ/মনিবেদিক-দেবীর মনিবদ্ধ, রাজস্থান। (শক্তি – গায়ত্রী ,ভৈরব – সর্বানন্দ)

২৭। শ্রীশৈল- দেবীর কর্ণকুণ্ডল, শ্রীহট্র, বাংলাদেশ। (শক্তি – মহালক্ষ্মী ,ভৈরব – সম্বরানন্দ)

২৮। কাঞ্চিদেশ- দেবীর কঙ্কাল, কঙ্কালীতলা, বোলপুর।(শক্তি – দেবগর্ভা ,ভৈরব – রুরু)

২৯। কালমাধব- দেবীর বাঁ নিতম্ব, মধ্যপ্রদেশ।(শক্তি – কালী ,ভৈরব – অসিতাঙ্গ)

৩০। শোন- দেবীর ডান নিতম্ব, মধ্যপ্রদেশ। (শক্তি – নর্মদা,ভৈরব – ভদ্রসেন)

৩১। রামগিরি- দেবীর ডান স্তন, উত্তরপ্রদেশ।(শক্তি – শিবানী ,ভৈরব – চন্দা)

৩২। বৃন্দাবন- দেবীর কেশজাল, ভূতেশ্বর মন্দির। (শক্তি – উমা, ভৈরব – ভূতেশ)

৩৩। শূচি বা অনল- দেবীর ওপরের দাঁতের পাটি, কন্যাকুমারী, ত্রিবান্দ্রম। (শক্তি – নারায়ণী ,ভৈরব – সংহার)

৩৪। পঞ্চসায়র- দেবীর অধোদন্তপংক্তি, সঠিক অবস্থান অজানা।(শক্তি – বরাহী , ভৈরব – মহারুদ্র)

৩৫। করতোয়াতট- সতীর তল্প, বগ্ডুড়া, বাংলাদেশ।(শক্তি – অর্পনা,ভৈরব – বামন)

৩৬। শ্রীপর্বত- সতীর ডান তল্প, গুন্টুর, অন্ধ্রপ্রদেশ।(শক্তি – শ্রীসুন্দরী ,ভৈরব – সুন্দরানন্দ)

৩৭। বিভাষ- দেবীর বাম গুল্ফ, তমলুক, মেদিনীপুর।(শক্তি – কপালিনী (ভীমরুপ), ভৈরব –সর্বানন্দ)

৩৮। প্রভাস- দেবীর উদর, কাথিয়াওয়ারা।(শক্তি – চন্দ্রভাগা,ভৈরব – বক্রতুণ্ড)

৩৯। ভৈরব পর্বত-দেবীর ঊর্ধ্ব ওষ্ঠ, উজ্জয়িনী, মধ্যপ্রদেশ।(শক্তি –অবন্তী ,ভৈরব – লম্বকর্ণ)

৪০। জনস্থানে/জলেস্থলে- সতীর চিবুক, নাসিক, মহারাষ্ট্র।(শক্তি –ভ্রামরী ,ভৈরব – বিকৃতাক্ষ )

৪১। গোদাবরীতট- সতীর বাম গণ্ড, রাজমহেন্দ্রী, অন্ধ্রপ্রদেশ। (শক্তি – রাকিনী বা বিশ্বেশ্বরী,ভৈরব – বত্সনাভ বা দণ্ডপাণি )

৪২। রত্নাবলী- দেবীর ডান স্কন্ধ, খানাকুল, হুগলী।(শক্তি –কুমারী ,ভৈরব – শিব)

৪৩। মিথিলা- দেবীর বাম স্কন্ধ, সঠিক স্থান অজানা। (শক্তি – উমা ,ভৈরব – মহোদর)

৪৪। নলহাটি- দেবীর নলা, নলহাটি, বীরভূম।(শক্তি – কালিকা দেবী,ভৈরব – যোগেশ)

৪৫। কর্ণাট- দেবীর কর্ণদ্বয়, হিমাচল প্রদেশ।(শক্তি – জয়দুর্গা, ভৈরব – অভিরু)

৪৬। বক্রেশ্বর- দেবীর মন/ভ্রূমধ্যস্থ, দুবরাজপুর, বীরভূম। (শক্তি –মহিষমর্দিনী,ভৈরব – বক্রনাথ)

৪৭। যশোহর- দেবীর পানিপদ্ম, খুলনা, বাংলাদেশ। (শক্তি –যশোরেশ্বরী ,ভৈরব – চন্দা)

৪৮। অট্রহাস- দেবীর ওষ্ঠ, লাভপুর, বীরভূম।(শক্তি – ফুল্লরা, ভৈরব – বিশ্বেশ

৪৯। নন্দপুর- দেবীর হার, সাঁইথিয়া, বীরভূম। (শক্তি – নন্দিনী ,ভৈরব – নন্দিকেশ্বর )

৫০। লঙ্কা- দেবীর নূপুর, শ্রীলঙ্কা। (শক্তি – ইন্দ্রাক্ষী,ভৈরব – রাক্ষসেশ্বর)

৫১। বিরাট- দেবীর উত্তর পাদাঙ্গুলি, জয়পুর। (শক্তি – অম্বিকা ,ভৈরব – অমৃতেশ্বর)

-তথ্য সংগ্রহ ইন্টারনেট, লেখা :সুস্মিতা বিশ্বাস , ছবি : সায়ান বিশ্বাস ( এই ছবি টির

শিল্পী সনাতন দিন্দা দূর্গা পূজার মণ্ডপ বরিষা ক্লাব ২০১৩)

Recent Posts

See All
গৌতম বুদ্ধ জীবন, ধৰ্ম ও দর্শন

খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গৌতম বুদ্ধের জন্ম হয়। জীবকে নির্বাণলাভের উপায় উপদেশ করে গেছেন তিনি যা মনুষ্য জীবনের অমূল্য সম্পদ। গৌতম বুদ্ধের পিতা ছিলেন রাজা শুদ্ধোদন, তিনি ছিলেন কপিলা বস্তুর রাজা আর মা

 
 
 
সম্রাট অশোক ও তার মহানুভবতা

ইতিহাসের লক্ষ-কোটি নৃপতির মধ্যে মৌর্য সম্রাট অশোক এর নামটি একাকী একটি নক্ষত্রের মতন জ্বলজ্বল করছে। কারণ মৌর্য সম্রাট অশোক কেবল ভারতবর্ষের ইতিহাসেই নয়,তাঁর মহানুভবতার জন্য তিনি বিশ্বের ইতিহাসেও এক

 
 
 

Comments


bottom of page